বিপা চৌধুরী প্রতিবেদক বিডি-অনলাইন ম্যাগাজিন ডটকম, Published Tue, Jue, 2, 2026, 2, 35, AM
ঢাকায় চলচ্চিত্রে যুগে যুগে কত নায়ক এসেছেন আর গেছেন । কেউ কেউ কয়েক বছর আলো ছড়িয়েছেন, কেউ এক যুগ রাজত্ব করেছেন, আবার সময় স্রোতে হারিয়ে গেছেন। কিন্তু একটা নাম দুই যুগের বেশি সময় ধরে বারবার ফিরে এসেছে দর্শকের মুখে, পোস্টারে, প্রেক্ষাগৃহে তিনি শাকিব খান।
দেওয়ালে পোস্টার ছাঁটানো আর মাইকে সিনেমার প্রচারের যুগ থেকে শুরু করে আজকের ডিজিটাল যুগ প্রতিটি পর্বেই তিনি নিজের তারকা খ্যাতি ধরে রেখেছেন। এখনো তার নতুন সিনেমার পোস্টার, গান, টিজার প্রকাশ পেলেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আলোড়ন তৈরি হয়। লাখ লাখ ভিউ, হাজারো মন্তব্য, আর অগণিত শেয়ার যেন আবারো মনে করিয়ে দেয় – দুই যুগ পেরিয়ে গেলেও দর্শকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে এখনো সেই একটাই নাম – শাকিব খান।
১৯৯৯ সালের ২৮ মে মুক্তি পেয়েছিল শাকিবের প্রথম সিনেমা ‘অনন্ত ভালোবাসা ‘। আর ঠিক ২৭ বছর পর , ২৮ মে মুক্তি পেয়েছে তার ২৫৫ তম সিনেমা’ রকস্টার ‘। শাকিবের জন্য এবারের পবিত্র ঈদুল আযহা তাই শুধু একটি উৎসব নয়, এটি যেন তার ক্যারিয়ারের এক বিশেষ মাইলফলক।
বিশেষ করে প্রিয়তমা, তুফান, বরবাদ, ও তাণ্ডব এর পর নতুন প্রজন্মের দর্শকদের মধ্যেও শাকিবকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন উন্মাদনা।
তিনি এখন একই সঙ্গে নতুন পুরনো দুই প্রজন্মের কাছেই জনপ্রিয় তারকা। এবারের ঈদেই এর প্রমাণ মিলেছে নতুন করে। ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত রকস্টার দেশের সর্বোচ্চ সংখ্যক প্রেক্ষাগৃহ পেয়েছে। ঈদের দিন স্টার সিনেপ্লেক্সের ছবিটি পেয়েছিল ১৮টি শো । কিন্তু দর্শক চাহিদা এতটাই বেড়ে যায় যে একদিনের ব্যবধানে শোর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াই
যে যাত্রা সহজ ছিল না :
আজকের এই অবস্থান দেখে অনেকেই ভুলে যান শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। সেই সময়ের সেই হ্যাংলা পাতলা তরুণকে দেখে কেউ ভাবেনি , একদিন তিনিই হবেন ঢাকায় সিনেমার সবচেয়ে বড় তারকা।
ক্যারিয়ারের শুরুতে এই শাকিবকে নিয়ে উপহাস হয়েছে অনেক। অভিনয় নিয়েও উঠেছিল প্রশ্ন। সালমান শাহর মতো প্রথম সিনেমা দিয়েই বিস্ফোরণ ঘটেনি তার। বরং বছরের পর বছর তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে, লেগে থাকতে হয়েছে, । মুনমুন, সাহারা, পরে শাবনুর, পপি, পূর্ণিমাদের বিপরীতে অভিনয় করতে করতে ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে তার অবস্থান। চলচ্চিত্রপাড়ায় দীর্ঘদিন একটা কথা প্রচলিত ছিল নায়ক মান্নার মৃত্যুর পরই নাকি খুলে যায় শাকিব খানের ভাগ্য। কিন্তু বাস্তবতা হলো সেই ভাগ্য তাকে তৈরি করে নিতে হয়েছে নিজের পরিশ্রমে।
সমালোচকদের চুপ করিয়ে দেওয়া ‘ সুভা’
ক্যারিয়ারের একটা বড় সময় পর্যন্ত শাকিবকে কেবল বাণিজ্যিক ছবির নায়ক হিসেবেই দেখা হতো। কিন্তু চাষী নজরুল ইসলামের শুভা বদলে দেয় সেই ধারণা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্পভিত্তিক সেই সিনেমায় তার অভিনয় দেখে অনেক সমালোচকই প্রথমবার নতুন করে ভাবতে শুরু করেন।
এরপর ‘দেবদাস ‘শাকিবকে এনে দেয় অভিনয়শিল্পীর স্বীকৃতি। শরৎচন্দ্রের বিখ্যাত চরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসা পান তিনি। আর কোটি টাকার কাবিন তাকে এনে দেয় আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা। ধীরে ধীরে তিনি এমন এক জায়গায় পৌঁছে যান, যেখানে দর্শক সিনেমা নয় শাকিব খানকে দেখতে প্রেক্ষাগৃহে যেতে শুরু করেন।
‘ডেড হর্স ‘থেকে প্রত্যাবর্তনের গল্প –
একটা সময় অনেকে সত্যি মনে করেছিল শাকিব খানের সময় শেষের পথে। ব্যক্তিগত জীবন, বিয়ে ডিভোর্স, নানা বিতর্ক, মামলা, বর্জন, এফডিসির রাজনীতি সবমিলিয়ে তিনি যেন ঘিরে পড়েছিলেন নেতিবাচক আলোচনায়। অনেকেই বলতেন শাকিবের ম্যাজিক শেষ।
নতুন যুগের নতুন শাকিব –
প্রিয়তমার পর যেন আর পেছনে তাকাতে হয়নি। রাজকুমার, তুফান, বরবাদ, তান্ডব একটার পর একটা সিনেমা তার তারকা খ্যাতি কে আরও বড় করেছে।
সেই সমালোচক রাই এখন বলেন , নাম্বার ওয়ান শাকিব খান। তার ভক্তদের কাছে তিনি নায়ক নন, ঢালিউডের রাজকুমার। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে কলকাতা সহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তৈরি করেছেন নিজের আলাদা অবস্থান। পশ্চিমবঙ্গ ও তার জনপ্রিয়তা চোখে পড়ার মতো। সময়ের সাথে নিজেকে আরো পরিবর্তন করেছেন তিনি। তার ফিটনেস, লুক, স্টাইল সবকিছুতেই এসেছে পরিবর্তন।
কেন এখনো তিনিই ভরসা
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের বর্তমান অবস্থার একটা বিষয় প্রায় সবাই স্বীকার করেন প্রযোজক দের কাছে সবথেকে বড় ভরসার নাম এখনো শাকিব খান। অনেক সিনেমায় মুক্তি পায় আলোচনাও হয়। কিন্তু টিকেট বিক্রি হল ভর্তি দর্শক উন্মাদনা এসব জায়গা এখনো সবচেয়ে বড় নিশ্চয়তা এর নাম তিনি শাকিব খান। এক যুগ আগেও বছরে দশটি থেকে বারটি সিনেমায় অভিনয় করতেন শাকিব প্রায় প্রতিদিনই থাকতো শুটিং। এখন সংখ্যা নয় নির্মাণের মানকে গুরুত্ব দেন। বরং গুরুত্ব দিচ্ছেন নতুন পরিকল্পনাকে। নির্মাণের মান ও আন্তর্জাতিক বাজারের দিকে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ও মধ্যপ্রাচ্যের বাংলাদেশী দর্শকদের মধ্য তার সিনেমা ঘিরে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। সেখানে তার সিনেমা চলে দিনের পর দিন।
ব্যক্তি জীবনের ঝড় ও থামাতে পারেনি তাকে।
তারকা খ্যাতির সঙ্গে সঙ্গে যেন শাকিবের জীবনেরও অংশ। বিয়ে ডিভোর্স , নানা বিতর্ক , সন্তান, মামলা, সম্পর্কের টানা পোড়েন কিছু নিয়ে বারবার শিরোনামে এসেছেন। কিন্তু এ কোন কিছুই তাকে থামাতে পারেনি। প্রতিবার তিনি আশ্চর্যজনক ভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। শত ঝড়ের পরেও নতুন করে ফিরেছেন । কৌতুহল আরো বাড়িয়েছেন। সব মিলিয়ে বলা যাই হয়তো তার কিছু ভুল আছে কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই প্রতিবারই ভরসায় তিনি।
১৯৯৯ সালের অনন্ত ভালোবাসা থেকে ২০২৬ সালের রকস্টার – এই দীর্ঘ যাত্রায় তিনি নিজেকে শুধু একজন নায়ক হিসেবেই নয়, এক যুগের প্রতিক হিসেবেও প্রতিষ্ঠা করেছেন। বাংলাদেশের মূলধারা সিনেমা যখন সংকটে পড়েছে , তখনো তার নাম ঘিরেই তৈরি হয়েছে আলোচনার কেন্দ্র, তার জন্যই প্রেক্ষাগৃহে ফিরেছে দর্শক, নতুন করে জেগেছে আশার আলো। অন্ধকারে জ্বালিয়েছেন আলো তিনি সেই দিনের সেই হ্যাংলা পাতলা তরুণ আজকের শাকিব খান।












Leave a Reply